রাজধানীর অদূরে গাজিপুরের টঙ্গিতে শনিবার সকালে একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। এতে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে দুজনের লাশ পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ বলেছে, এই ঘটনায় এক কনস্টেবল নিখোঁজ রয়েছেন।

টঙ্গি থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শনিবার রাতে আমরা টঙ্গি এলাকা থেকে দুজনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছি।
“শনিবার সকালে নিপ্পন গার্মেন্টেসের ঘটনাতেই তারা মারা গেছেন। তবে তারা এই কারখানার কোনো শ্রমিক নন।”
সকাল ৯টা থেকে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার সংঘর্ষে টঙ্গির এরশাদ নগর এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে আরো ২৭ পুলিশ সদস্যসহ অন্তত দেড় শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ দুই শতাধিক রাউন্ড রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। পুলিশ গুলি ছোড়ে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নিপ্পন গার্মেন্টস নামের ওই পোশাক কারখানার বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-ময়নসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে ১৬-১৭টি গাড়ি ভাঙচুর করে। তারা আরেকটি পোশাক কারখানার স্টাফ বাস এবং একটি মোটর সাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। অবরোধ ও সংঘর্ষের কারণে দুপুর ১টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল।
এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পুলিশ ১৯ জনকে আটক করেছে।
শ্রমিকরা দাবি করেছেন, এই ঘটনা তাদের কয়েকজন সহকর্মী নিহত হয়েছেন। পুলিশ তাদের লাশ সরিয়ে ফেলেছে।
তবে সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সাহারা খাতুন সাংবাদিকদের বলেন, “কেউ নিহত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। পুলিশসহ কয়েকজন আহত হয়েছে।”
পুলিশ প্রধান নূর মোহাম্মদ ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, “কারখানাটি গতকাল লে অফ করা হয়। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ তা আমাদের জানায়নি। জানালে এ ধরনের অপ্রীতিকর অবস্থা এড়ানো যেত।”
সংঘর্ষের সূত্রপাত: নিপ্পন গার্মেন্টেস এর শ্রমিকরা জানায়, পাওনা পরিশোধের আশ্বাসে শ্রমিকরা শুক্রবার রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ করেছে। শনিবার সকালে তারা কারখানায় এসে দেখেন কর্তৃপক্ষ অর্থনৈতিক মন্দার কারণ দেখিয়ে ৩১ অক্টোবর থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত লে- অফ ঘোষণা করে গেটে নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়েছে। নোটিশে ১০ নভেম্বর বেতন পরিশোধের তারিখ উল্লেখ করা হয়।
পারভীন নামে কারখানার এক শ্রমিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মালিক পক্ষ বেশ কিছুদিন ধরেই কারখানা বন্ধ করে দেব দেব করছিল। তবে কারখানা বন্ধ করতে হলে আমাদের আইন অনুযায়ী প্রাপ্য দিতে হবে।”
তিনি জানান, কয়েকদিন আগে তারা সেপ্টেম্বরের বেতন পান।
মাজেদা বেগম নামে আরেক শ্রমিক বলেন, “সকালে কারখানায় এসে দেখি কারখানার গেটে তালা। অথচ আমাদের বেতন পাওনা রয়েছে। এ অবস্থা দেখে শ্রমিকরা তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়।”
সংঘর্ষ: পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ওপর অবস্থান নেয় এবং গাড়ির টায়ার পুড়িয়ে ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পুলিশ অবরোধকারীদের মহাসড়ক থেকে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যর্থ হয়ে লাঠিপেটা শুরু করলে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়।
শ্রমিকরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এ সময় তারা ১৬-১৭টি গাড়ি ভাঙচুর করে এবং অপর একটি পোশাক কারখানার স্টাফ বাস ও একটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করে। তারা কয়েকজন পুলিশকে মারধোর করে।
অবস্থা বেগতিক দেখে বিক্ষব্ধ শ্রমিকদের লক্ষ্য করে পুলিশ শটগানের গুলি ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ সময় পার্শ্ববর্তী এরশাদ নগরসহ আশ-পাশের এলাকার সহস্রাধিক লোক শ্রমিকদের সঙ্গে যোগ দেয়। এক পর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে অলি-গলিতে।
দুপুর ১টা পর্যন্ত দফায়-দফায় পুলিশ- শ্রমিক সংঘর্ষ চলতে থাকে। পুলিশ বিভিন্ন গলিতে ঢুকে নির্বিচারে লাঠিপেটা এবং গুলি করে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। পরে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে।
সংঘর্ষের পর স্থানীয় সাংসদ জাহিদ আহসান রাসেল, পুলিশের মহাপরিদর্শক নূর মোহাম্মদ, র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) খন্দকার হাসান মাহমুদ, ঢাকা পুলিশ রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোখলেসুর রহমান, টঙ্গি পৌর মেয়র আজমত উল্লাহ খান, যুবলীগ সভাপতি আব্দুল সাত্তার মোল্লা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
হতাহত: সংঘর্ষের কয়েকজন শ্রমিকসহ তিনজন নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছেন শ্রমিকরা। তারা দাবি করেন, পুলিশ ভ্যানে করে নিহতদের লাশ অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায় ।
তবে রাত সাড়ে ১০টায় পুলিশ দুজনের লাশ উদ্ধার করেছে বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানিয়েছেন টঙ্গি থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা।
তিনি জানান, নিহতদের মধ্যে একজনের নাম বাবুল শেখ (৩০)। আরেকজনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তার বয়স আনুমানিক ৪৫ বছর।
রাতে এএসপি আখতারজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, টঙ্গি থেকে উদ্ধার করা দুটি লাশ ময়না তদন্তের জন্য গাজিপুর সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তবে নিহতদের পরিচয় জানাতে পারেননি তিনি।
টঙ্গি থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুহুল আমিন জানান, শ্রমিকদের হামলা ও ইট-পাটকেলের আঘাতে পুলিশের সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট (এএসপি) মো. আক্তারুজ্জামান, এসআই আবুল কালাম আজাদসহ অন্তত ২৭ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতাল ও গাজিপুরের বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এর ঢাকা মেডিকেল প্রতিনিধি জানান, দুপুর ১টা পর্যন্ত আহত ১৪ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। এদের বেশিরভাগই শ্রমিক। অন্যরা দোকানি ও রিকশাচালক। তারা সবাই গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
এরা হলেনÑ পথচারী মো. বিল¬াল হোসেন (২৫), গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তার হোসেন (২৫), সুমি বেগম (২০), আলেয়া বেগম ৩৫), সালেহা বেগম (২০), ফরিদা বেগম (২২), মনোয়ারা বেগম (২৬), আকতার হোসেন (২০), রিকশাচালক মো. আলম (৩৮), বাচ্চু (৪০), বাসের হেলপার সোহেল (২৫), ফুটপাতের পিঠা বিক্রেতা ফজল বেপারি (৬০), হোটেল কর্মচারী সালাম (২০), দিনমজুর রুহুল আমিন (৩২)।
গাজিপুর প্রতিনিধি জানান, নিহত বাবুল শেখ ভ্যান চালক। তার স্ত্রী রোকসানা নিপ্পন গার্মেন্টেসের শ্রমিক। দুই সন্তানসহ এরশাদ নগরে ৫ নম্বর সেক্টরে ভাড়া থাকতেন তারা। স্ত্রীর খোঁজে ঘটনাস্থলে এসে তিনি মারা যান।
গাজিপুরের পুলিশ সুপার মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দুইজন মহিলা কনস্টেবলকে পাচ্ছি না। তবে তাদের কী অবস্থা, তা আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।”
সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত নিপ্পন গামেন্টস কারখানা ও আশ-পাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। কারখানা এলাকার বিভিন্ন স্থানে ছোপছোপ রক্তের দাগ, ইট-পাটকেল, জুতা ও পোশাক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
নিখোঁজ শ্রমিকদের খোঁজে তাদের স্বজনদের কারখানা এলাকা, হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে ছোটাছুটি করতে দেখা গেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য: সন্ধ্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন দাবি করেন, টঙ্গিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পর সরকার কোনো লাশের খবর পায়নি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে ওই ঘটনায় আহতদের দেখে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “পুলিশ যদি নির্বিচারে গুলি চালিয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সেটি তদন্ত করে দেখা হবে।”
এ ঘটনায় কতজন নিহত হয়েছে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সাহারা বলেন, “কেউ নিহত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। পুলিশসহ কয়েকজন আহত হয়েছে। পুলিশ সদস্যদের রাজারবাগ হাসপাতালে আমি দেখে এসেছি। অন্যদের এখানে দেখে গেলাম।”
বিজিএমইএ’র তদন্ত কমিটি: ঘটনা তদন্তে বিজিএমইএ পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
বিজিএমইএ সহ-সভাপতি ফারুক হাসানকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- পরিচালক রিয়াজ বিন মাহমুদ, মো. নাসির, শহিদুল্লাহ আজিম ও সংগঠনের সাবেক পরিচালক এস এম মান্নান কচি।
টঙ্গিতে পোশাক শ্রমিক ও পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় ‘বাইরের’ ইন্ধন থাকার সন্দেহ প্রকাশ করেছে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।
বিজিএমইএ সভাপতির বক্তব্য: শনিবার বিকালে বিজিএমইএ ভবনে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি সালাম মুর্শেদী বলেন, “এর পেছনে ‘বাইরের’ ইন্ধন থাকতে পারে। অন্য কোনো জায়গা থেকে লোক নিয়ে এসে অস্থির অবস্থা তৈরির চেষ্টা হয়েছে। তদন্ত করলে সঠিত তথ্য বেরিয়ে আসবে।”
তবে ‘বাইরের’ ইন্ধন বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন তা পরিষ্কার করেন নি তিনি।
বকেয়া বেতনের কারণে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়নি দাবি করে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ওই কারখানা তিন মাস ধরে সঙ্কটে থাকলেও বেতন বকেয়া নেই। শ্রমিকদের সঙ্গে শুক্রবার আলোচনার পর কারখানা মালিক শনিবার থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখার নোটিশ দেন। তাতে শ্রমিকদের চলতি মাসের বেতন ১০ নভেম্বর নিয়ে যেতে বলা হয়।